ওসমান গনি : দেশে করোনাভাইরাসের জন্য আরোপিত সরকারী বিধিনিষেধ শর্তাসাপেক্ষে শিতিল করায় মানুষের অবাধ চলাফেরার কারনে করোনাভাইরাসে আক্রান্তের সংখ্যা অগনিত হারে বাড়ছে। দীর্ঘতর হচ্ছে বাংলাদেশে মৃত্যুর মিছিল। এক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে রাজধানী ঢাকা। এরই মধ্যে প্রাণঘাতী এই ভাইরাসের মহামারি ঠেকাতে দুই মাসের সাধারণ ছুটি শেষে অফিস, আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর পাশাপাশি গণপরিবহনও চালু হয়েছে। এ খবরে ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন এলাকার রাস্তাঘাটে মানুষ ও যানবাহনের সংখ্যা বাড়ার পাশাপাশি উদ্বেগজনকভাবে বেড়েছে অযথা ঘোরাঘুরিও। এদিকে, দেশে প্রতিদিন বাড়তে শুরু করছে করোনা আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা ও মৃত্যুর সংখ্যা। রোগীর এই চাপ সামলাতে হাসপাতাল ব্যবস্থাপনা নিয়ে নতুন করে ভাবার তাগিদ দিচ্ছেন বিশেষজ্ঞরা।

দেশের প্রত্যন্তঞ্চলে নারী-শিশুসহ বিভিন্ন বয়সের মানুষের ঢল নেমেছে, তারা ঘুরতে এসেছেন। আড্ডা-খোশগল্প করছেন। গড়াগড়ি-গলাগলি করে মোবাইল ফোনে সেলফি তুলছেন। সরকারের স্বাস্থ্য অধিদফতরের প্রতিদিনের বুলেটিনে করোনা সংক্রমণের ঝুঁকি এড়াতে মাস্ক পরা, কমপক্ষে তিন ফুট সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখাসহ নানা স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার কথা বলা হলেও কেউ তার কর্ণপাত করছে না। যে যার খেয়াল খুশিমত চলছে। দেশের স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরাও গণমাধ্যমে একই বিষয়ে তাগাদা দিচ্ছেন। বলছেন জরুরি প্রয়োজন ছাড়া ঘর থেকে না বেরোতে। প্রয়োজন পড়লে অবশ্যই মুখে মাস্ক ও হাতে গ্লাভস পরার কথা বলছেন তারা।
দেশের বিভিন্ন এলাকায় বিশেষ করে রাজধানী ঢাকার বিভিন্ন এলাকায় মানুষের ঘোরাঘুরির নমুনা দেখলে যে কারো মনে হবে, এসব পরামর্শ তোয়াক্কা করছেন না বেশিরভাগ মানুষই। বিশেষ করে উঠতি বয়সিদের মধ্যে স্বাস্থ্যবিধির ব্যাপারে খামখেয়ালি লক্ষ্য করা যাচ্ছে বেশি। ফলে করোনা ছড়াচ্ছে মারাত্মক হারে। স্বাস্থ্য অধিদফতরের সর্বশেষ হেলথ বুলেটিন ০২ জুন /২০২০, অনুসারে, দেশে যে ৫২,৪৪৫ হাজারেরও মানুষ আক্রান্ত হয়েছেন, তাদের মধ্যে সাড়ে ১৫ হাজারেরও বেশি ঢাকায় আক্রান্ত হয়েছেন। এছাড়া মৃত মোট ৭০৯ জনের মধ্যে বেশীর ভাগ লোকজনই ঢাকায় মারা গেছেন। মোট সুস্থ্য ১১,১২০ জন। ৮ মার্চ প্রথম শনাক্তের সংক্রমিতের সংখ্যা ১০ হাজার পৌঁছাতে সময় লেগেছে ২৮ দিন। দ্বিতীয় ১০ হাজার হয়েছে ১১ দিনে আর তৃতীয় ১০ হাজার রোগী মিলেছে সাত দিনেই। এরই মধ্যে বিধিনিষেধ শিথিল করা হয়েছে। এখন হর হামেশা চলার কারনে করোনা বাড়বে দ্রুত গতিতে। এই অবস্থায় হাসপাতাল ব্যবস্থাপনা সবচেয়ে জরুরি বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকরা।তাদের মতে, সবার আগে নিশ্চিত করতে হবে সাধ্যের মধ্যে সর্বোচ্চ সংখ্যক শয্যা। প্রতিটি হাসপাতালেই থাকতে হবে কোভিড-১৯ চিকিৎসা সক্ষমতা। আর নিশ্চিত করতে হবে পর্যাপ্ত অক্সিজেন সরবরাহ।
দেশে যেভাবে রোগী বাড়ছে দেখা যাবে ২০ থেকে ৫০ শতাংশ রোগী হাসপাতালে ভর্তি হবে। সেভাবে আগে থেকেই ব্যবস্থা নিতে হবে। শঙ্কা রয়েছে শক্ত হাতে হাল না ধরলে নিয়ন্ত্রণের বাইরে যেতে পারে পরিস্থিতি। হাসপাতাল থেকে রোগী ছেড়ে দেওয়ার প্রক্রিয়াও নজরদারির আওতায় আনা জরুরি বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকরা।
৩১ মে থেকে দেশের বিভিন্ন অফিস , বাস-লঞ্চ-ট্রেন-বিমান, পুঁজিবাজার, ব্যাংক খোলার কারনে দেশের পরিবেশ আগের আগের মতোই হয়েছে। দোকানপাট তো ঈদের আগেই খুলেছিল। ভাইরাস সংক্রমণের দিক থেকে নাজুক পরিস্থিতির মধ্যে এভাবে সব খোলার সিদ্ধান্তকে আত্মঘাতী মনে করছেন সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা। আপত্তি এসেছে বিভিন্ন রাজনৈতিক দল থেকেও। তবে সরকারের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, অর্থনীতি সচলের জন্য স্বাস্থ্যবিধি মেনেই এসব খোলা হয়েছ। ১৫ জুন পর্যন্ত পরিস্থিতি দেখে পরবর্তী পদক্ষেপ নেওয়া হবে। তবে ততদিনে পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার অবস্থায় থাকবে কি-না, তা নিয়ে সংশয় রয়েছে বিশেষজ্ঞদের। কেননা দেশে ‘লকডাউন’ও ঠিকভাবে করা যায়নি, যে কারণে ভাইরাস এখন ৬৪ জেলায়ই ছড়িয়ে পড়েছে।
বাংলাদেশের আগে বিভিন্ন দেশ লকডাউন শিথিল করে জনজীবনে স্বাভাবিক করার পথে হাঁটতে শুরু করে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সতর্কবার্তা অনেকটাই উপেক্ষা করেই। তবে অন্যান্য দেশ তখনই লকডাউন শিথিল করেছে, যখন তাদের দেশে সংক্রমণ ও মৃত্যুর হার কমে আসছিল। কিন্তু বাংলাদেশ স্বাভাবিক জীবনে ফিরছে যখন, তখন আক্রান্তের হার সবচেয়ে বেশি বাড়ছে। এই পরিস্থিতি সবকিছু খোলার পর স্বাস্থ্যবিধি কঠোরভাবে অনুসরণের মাধ্যমে পরিস্থিতি আরো নাজুক হওয়া ঠেকাতে চাইছে সরকার। সেজন্য চলাফেরায় বিধিনিষেধ আগের মতোই থাকছে।

লেখক – সাংবাদিক ও কলামিস্ট
Email- [email protected]