তানিজা খানম জেরিন : “ রুখে দাও ধর্ষণ “ এই শ্লোগানে সারা বাংলাদেশ আজ কম্পমান কিন্তু এই লেখার শুরুতেই বার বার আমার চোখের সামনে ভেসে উঠছে ফুলন দেবীর কাহিনীচিত্র। একজন ধর্ষিতা ফুলন দেবীর কাহিনী নিয়ে একজন দলিত ধর্ষিত নারী কিভাবে প্রতিবাদী ফুলন দেবী হয়ে উঠে সেই মুভির স্মৃতি বার বার নাড়া দিয়ে যাচ্ছে। আহা! আমাদের দেশেও যদি এরকম একজন ফুলন দেবীর জন্ম হত তাহলে দেশের নারীকূল নির্ভয়ে দিনযাপন করতে পারতো।

ভারতের এই নারী ফুলন দেবী তেইশজন পুরুষ কর্তৃক ধর্ষিত হওয়ার পর ধর্ষক তেইশজনকেই হত্যা করে ধর্ষকদের চূড়ান্ত শাস্তি নিশ্চিত করে। আমাদের দেশে ও যদি অনেক সময় সর্বোচ্চ পাঁচ/ছয়জন কর্তৃক ধর্ষিত হওয়ার রেকর্ড রয়েছে দুর্ভাগ্য কোন ফুলন দেবীর জন্ম হয়নি। যদিও বিচ্ছিন্ন ভাবে দু’চারটি লিঙ্গ কর্তনের খবর চোখে পরেছে আরও কিছু লোমহর্ষক কাহিনী ইতিমধ্যে পত্র পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছে কিন্তু বিশ্বের সব দেশেই প্রতিনিয়ত কম বেশী ধর্ষণের ঘটনা ঘটছে এবং প্রায় সব দেশেই ধর্ষণকারীর রাষ্ট্রীয় আইন অনুযায়ী সর্বোচ্চ শাস্তি হচ্ছে।

আপাতদৃষ্টিতে মনে হচ্ছে বাংলাদেশই একমাত্র দেশ উল্টাপথে চলে; অতি আশ্চর্যের বিষয় স্বাধীনতা পরবর্তী গত প্রায় পাঁচ দশকে বেশীর ভাগ ক্ষেত্রেই সর্বক্ষমতাসীন দলীয় সাঙ্গ পাঙ্গরাই ধর্ষণ কর্মে বেশি ব্যস্ত ছিল এবং আরো বেশি আশ্চর্যের বিষয় ক্ষমতাসীনদের নেকনজর এবং হস্তক্ষেপের কারণে বিচার বিলম্বিত হয় এবং ধর্ষণকারীরা অনায়াসেই খালাশ পেয়ে যায় এবং আরো আশ্চর্যের বিষয় গত সাড়ে চার বছরে সাড়ে চার হাজার ধর্ষণের ঘটনা ঘটেছে অর্থাৎ বাংলাদেশে গড়ে প্রতিদিন তিনটি ধর্ষণের ঘটনা ঘটছে। বাস্তবে ধর্ষণের ঘটনা আরো বেশি ঘটছে কিন্তু নানাবিধ কারণে ধর্ষণের ঘটনা প্রকাশিত বা নথিবদ্ধ হচ্ছেনা। “ রুখে দাও ধর্ষণ “ এই শ্লোগানে দেশ আজ বিক্ষুব্ধ ও উত্তাল।

 

বাংলাদেশের সচেতন সকল পেশার লোকজন আজ রাস্তায় ধর্ষণ বিরোধী আন্দোলনে শামিল হয়েছে, দেশের প্রতিটি নারী পুরুষ আজ ধর্ষণকারীদের ধিক্কার জানাচ্ছে।। সব চেয়ে বড় উদ্বেগের বিষয় হল আমরা আমাদের সমাজকে আলোর দিকে প্রসারিত না করে অন্ধকারে ঠেলে দিচ্ছি আমাদের চোখের সামনে মা-বোন ও ছোট শিশুরা ধর্ষিত হচ্ছে আমরা কিভাবে চুপ হয়ে বসে থাকি আমাদের উচিত এখনই রুখে দাঁড়ানোর; প্রতিবাদের মশাল হাতে নিয়ে।

২৫শে সেপ্টেম্বর সিলেটের এমসি কলেজে স্বামীকে আটক রেখে স্ত্রীকে দলবেধে ধর্ষণ করা হয়েছে এবং খাগড়াছড়িতে ডাকাতি করতে গিয়ে প্রতিবন্ধী এক কিশোরিকে ধর্ষণ করা হয়েছে ফের সিলেটে ঘরে ঢুকে জোরপূর্বক গৃহবধুকে ধর্ষণ করেছে এইসব নিন্দনীয় ঘটনার বর্ণনা দিয়ে শেষ করা যাবেনা মনে হচ্ছে আজ বিবস্ত্র বাংলাদেশ ধর্ষিত বাংলাদেশ। “ রুখে দাও ধর্ষণ “ এই শ্লোগানে বিশ্বে প্রতিটি বাংলাদেশী প্রবাসী ও অভিবাসী সম্মিলিত কণ্ঠে প্রতিবাদ এবং ধিক্কার জানাচ্ছে।

নারীরা ঘরে থাকলেও নিরাপদ নয় বাইরে গেলেও নিরাপদের প্রশ্নই উঠেনা। স্কুল কলেজ মাদ্রাসা ও বিশ্ববিদ্যালয়গুলি হল আমাদের শিক্ষার আবরণ এখানে ছেলেমেয়েদেরকে আমাদের শিক্ষকরা জ্ঞানের প্রসার বিস্তার করেন এবং আমাদের চিন্তা চেতনার বহি-প্রকাশ ঘটান সেই সব শিক্ষালয়ের শিক্ষার আলোকে নিভিয়ে ধর্ষণের মত ঘৃণিত কার্যকলাপ শুরু হয় তাহলে আমরা জাতি হিসেবে কোথায় গিয়ে দাঁড়াচ্ছি ? আমরা শুধুই অন্ধকারের দিকে নিমজ্জিত হচ্ছি ।

নারী জাতির সভ্রম নিয়ে বেঁচে থাকার অধিকার নেই আমরা কি ধাবিত হচ্ছি- সেই আদিম জাহিলিয়াত যুগে, তাহলে আমরা আমাদের আগামী প্রজন্মকে নিয়ে কি ভাবে স্বস্তিতে নিরাপদে থাকবো। আমরা মা-বোন ও স্ত্রী-কন্যা কিভাবে রাস্তায় বের হবো বা কর্ম ক্ষেত্রে যাবো বা স্কুল কলেজ মাদ্রাসা ও বিশ্ববিদ্যালয় পাঠাবো বা বাসে ট্রেনে যাতায়ত করবো কোথাও নিরাপত্তার বলয় নেই। প্রতিনিয়তই ঘটছে ধর্ষণ নিপীড়ন ও লাঞ্ছিত হওয়ার মত অনেক নৃশংস ঘটনা কিন্তু নারীদের নেই কোন প্রতিবাদের ভাষা। বিশ্বের সর্বত্র নারীরা আজ নিগৃহীত।

“ রুখে দাও ধর্ষণ “ এই শ্লোগান আজ বিশ্বে প্রকম্পিত হলেও এটাও চরম সত্য যে ধর্ষকের হাত থেকে বাঁচতে হলে প্রতিটি নারীকেই আত্মরক্ষার কৌশল রপ্ত করতে হবে আমরা জানি উন্নত বিশ্বে প্রতিটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানেই মেয়েদেরকে আত্মরক্ষার বিভিন্ন কৌশল প্রশিক্ষণ দিয়ে থাকে এবং ছোট বেলা থেকেই আত্মরক্ষার সঠিক ধারণা তৈরি করে; আমাদের দেশেও তদ্রুপ আত্মরক্ষার বিষয় পাঠ্য পুস্তকে অন্তর্ভুক্ত করতে হবে; প্রয়োজনীয় আত্মরক্ষার কৌশল শিক্ষা দিতে হবে এবং পারিবারিক ভাবেও আলোচনা করতে হবে কিভাবে নিজেকে আত্মরক্ষা করা যায়। উল্লেখ্য বিশ্বের অনেক দেশেই ধর্ষণ একটা বড় সমস্যা।

সরকারী পরিসংখ্যান অনুযায়ী দেশে প্রতিদিন ৩/৪টি ধর্ষণের ঘটনা ঘটছে; তবে অ্যাক্টিভিস্টরা বলছেন, এ সংখ্যা কোন ভাবেই সঠিক নয় কেননা অনেক ধর্ষণের ঘটনাই পুলিশের কাছে রিপোর্ট করা হয়না কারণ বিষয়টি জানাজানি হলে ধর্ষিতা সামাজিকভাবে হেয় হবেন, এই শঙ্কায় বিষয়টি অনেকেই চেপে যান। পরিসংখ্যানে যাই থাকুক দেশে ধর্ষণের মহা উৎসব চলছে এটা অনস্বীকার্য। সময় এসেছে ধর্ষণ রোধে কার্যকরী বাস্তব পদক্ষেপ গ্রহণের এবং ঘটিত ধর্ষণের অতি দ্রুত সময়ে দৃষ্টান্তেমূলক শাস্তির ব্যবস্হা করা। “ রুখে দাও ধর্ষণ “ এই শ্লোগান সামাজিক ভাবে এবং রাষ্ট্রীয় ভাবে দেশে টেকসই সূদুর প্রসারী পরিকল্পনা নিয়ে অতি দ্রুত বাস্তবায়িত করতে হবে প্রচলিত বিচার ব্যবস্হা পরিবর্তন করে ধর্ষণ সংক্রান্ত সকল মামলা অতি অগ্রাধিকার ভিত্তিতে এবং অবশ্যই শাস্তির বিধান দৃষ্টান্তমূলক করা দরকার।

ধর্ষণকারী যেই দলেরই হোক না কেন দলীয় প্রভাবমুক্ত বিচার প্রক্রিয়া সম্পন্ন করার দাবী দেশের আপামর জনতার। সামাজিক প্রতিরোধের জন্য প্রতিটি এলাকায়ই অভিভাবকসহ সকল পেশাজীবিদেরকে নিয়ে প্রতিরোধ কমিটি গঠন করা সময়ের দাবী; আমরা যেমন নিরাপদ বিশ্ব চাই ঠিক তেমনি স্বাধীনভাবে সভ্রম নিঁয়ে সমান অধিকারের ভিত্তিতে এই বিশ্বে বসবাস করতে চাই। এই বিশ্ব থেকে দূর হয়ে যাক ধর্ষণের কালিমা : বিশ্বের সকল দেশের মা-বোন